নদীমাতৃক বাংলাদেশে অর্থনীতি ও কৃষিতে যুগান্তকারী মহাবিপ্লব ঘটিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ক্ষণজন্মা এ রাষ্ট্রনায়কের বহুমাত্রিক অবদান এবং দেশপ্রেমের অক্ষয়-অব্যয় ভূমিকার পুরো ভাগজুড়ে ছিল খাল খননের মাধ্যমে সবুজ বিপ্লব। তলাবিহীন ঝুড়ির কালিমা থেকে দেশকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অভাবনীয় সাফল্যের সোপানে নিয়ে যান।
শহীদ জিয়াউর রহমান দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি নিজে খাল খনন করে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছেন। খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করে বিদেশে রপ্তানি করেছেন।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ জিয়াউর রহমান সমাজকে সংগঠিত করার এক অনন্য নজির হচ্ছে খাল খনন কর্মসূচি। এ কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয়। আপাতদৃষ্টে এ কর্মসূচিকে শুধুই খাল খনন মনে করা হতো। কিন্তু এর বহুমুখী উদ্দেশ্য ছিল, যেমন কৃষিতে সেচ নিশ্চিত করা, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা। সারা দেশে খাল খনন করে প্রাকৃতিক জলাধার নির্মাণের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির পরিবর্তে উপরিভাগের পানির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। শুষ্ক মৌসুমে এসব খালের পানি সেচকাজে ব্যবহার করা হতো। এ ছাড়া খালগুলোতে মাছের উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। মূলত খাল খনন বিএনপির রাজনীতির অন্যতম পিলার।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে খাল খনন অন্যতম একটি দফা আছে। বিএনপির ৩১ দফা হচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষের আগামী দিনের মুক্তির সনদ। শহীদ জিয়াউর রহমানের জ্যোতির্ময় সুযোগ্য উত্তরসূরি প্রজ্ঞাবান রাজনীতিবিদ তারেক রহমান সংস্কারের ৩১ দফায় খাল-নদী পুনঃখনন কর্মসূচি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করে বলেছেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট ও ক্ষতি মোকাবিলায় টেকসই ও কার্যকর কর্মকৌশল গ্রহণ করা হবে। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সর্বাধুনিক ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ করে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। নদী ও জলাশয় দূষণ প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং বন্যা ও খরা প্রতিরোধে খাল-নদী পুনঃখনন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে। সামুদ্রিক সম্পদের বিজ্ঞানসম্মত জরিপ ও মজুতের ভিত্তিতে তা আহরণ এবং অর্থনৈতিক ব্যবহারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখননের মাধ্যমে পানির প্রবাহ পুনঃস্থাপন ও কৃষি উৎপাদনের গতি ফেরাতে হবে। এ খালগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কসবা উপজেলার কুটি জাজিয়ার জিয়া খাল। খালটি আওয়ামী লীগ দখলকারীদের দৌরাত্ম্যে অনেক জায়গায় বেদখল হয়ে গেছে। খালগুলোকে পুনরুদ্ধার করে সংস্কার করা অতীব জরুরি।
জেলার কৃষির চিত্র: সম্ভাবনা ও সংকট
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোট আয়তন ১৮৮১.২০ বর্গকিলোমিটার। জেলার আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ১,৮০,০০০ হেক্টর, যার মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ সেচনির্ভর। তবে বহু খাল, বিল ও জলাশয় দখল, পলি পড়া ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (BARC) ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলায় ধানের গড় উৎপাদন হেক্টরপ্রতি ৪.৬ টন। সঠিক সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা থাকলে উৎপাদন ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর, বিজয়নগর, কসবা, আখাউড়া, নাসিরনগর, সরাইলসহ নয়টি উপজেলায় বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা ও শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে কৃষকের জীবন ও জীবিকা ব্যাহত হয়।
খাল ও নদী: সম্ভাবনার ধমনি
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় রয়েছে একাধিক ছোট-বড় নদী ও খাল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নদীগুলো হলো—তিতাস, মেঘনা, বিজনা, সিনাই, সালদা, কালিয়ারা, বুড়ি ইত্যাদি। এ ছাড়া রাজার খাল, সাঙ্গুর খালসহ বহু খাল এখন পলি ও দখলে বন্ধ হয়ে আছে।
মাছ চাষ ও জলজ সম্পদ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাছ উৎপাদনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। জেলার সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বেসরকারি মাছের খামার ২৪৬টি। মোট আয়তন ৪০৬.১৪ হেক্টর। মাছ উৎপাদন ৪,৭২৫.৪২ টন। তিতাস নদীতে বর্তমানে প্রায় ৮৩টি মাছের প্রজাতি পাওয়া যায়, যার মধ্যে ভারতের আগরতলা থেকে একটি দূষিত বর্জ্যবাহী কালো পানি তিতাস নদীতে মেশার কারণে তিতাস নদীর পানি সম্পূর্ণ অক্সিজেন শূন্য হয়ে গেছে। যার ফলে অনেক প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং আরও ১৯টি প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে এবং তিতাসপাড়ের জনসাধারণ ভয়ংকর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।




