কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন: তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নৌকার প্রার্থীদের জয়-পরাজয় অনিশ্চিত
সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে মেয়র প্রার্থীদের প্রচারণায় এখন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে কুমিল্লা। ঢাকা চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী এই সিটি করপোরেশনের উপনির্বাচনে মেয়র পদে মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা নূর-উর রহমান মাহমুদ তানিম, সাবেক মনিরুল হক সাক্কু, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. তাহসিন বাহার সূচনাসহ ৪ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এবারের নির্বাচনে মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা নূর-উর রহমান মাহমুদ তানিম ও সাবেক মনিরুল হক সাক্কু এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তারা বলছেন, নির্বাচনের মাঠে ব্যক্তি ইমেজে মহানগর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা নূর-উর রহমান মাহমুদ তানিম ওও সাবেক মনিরুল হক সাক্কু অনেক এগিয়ে।
সাক্কু ও তানিমের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
একবার পৌরসভার মেয়র ও দুইবার সিটি মেয়র মিলিয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর টানা কুমিল্লা নগরীর ক্ষমতায় ছিলেন মনিরুল হক সাক্কু। এদিকে মহানগর আওয়ামীলীগের একক প্রার্থী দাবিকারী ডা. তাহসীন বাহার সূচনা। তবে আফজাল খানের পরিবারের সঙ্গে ‘দূরত্ব’ তাহসীন বাহার সূচনাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলছে। পাশাপাশি সাবেক মেয়র সাক্কুকে বিএনপি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সমর্থন রয়েছে তার পক্ষে। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কিছু অংশ এবং বিএনপি ও নৌকা বিরোধীপক্ষের ভোট পড়তে পারে সাক্কুর ব্যালটে। ফলে ৯ মার্চের নির্বাচনের ফলাফল যে কারও পক্ষে যেতে পারে। তারা আরও বলছেন, সাবেক ছাত্র নেতা নূর উর রহমান মাহমুদ তানিমও একজন ভদ্র সাহসী এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে খুব সহজে মিশতে পারেন। বিশেষ করে তরুন ভোটারদের কাছে তিনি বেশ জনপ্রিয়। এ তরুনদের ওপর ভিত্তি করেই ২০১২ এবং ২০১৭ সালে মনিরুল হক সাক্কু মেয়র নির্বাচিত হন। কিন্তু এবারের নির্বাচন পরিস্থিতি ভিন্ন। এবারও সাক্কুকে নিজ দলের একটি অংশের বিপক্ষেও লড়াই করতে হবে। স্থানীয়দের অভিমত, নির্বাচনের মাঠে দলীয় প্রার্থী না থাকলেও বিএনপি এবং জামায়াতের সমর্থকদের বেশিরভাগ ভোট সাক্কু ও তানিমের পক্ষে যেতে পারে। পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামের সমর্থকদের বড় অংশের ভোটও যেতে পারে তাদের দু’জনের ব্যালটে।
আফজাল খানের পরিবারের প্রভাব
অন্যদিকে মহানগর আওয়ামীলীগ বাহার কন্যা সূচনার পক্ষে থাকার ঘোষণা দিলেও তার মহাণগর আওয়ামীলীগের একটি অংশ শেষ পর্যন্ত এই অবস্থানেই থাকবে কি না তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। যদিও বিগত ২০১২ ও ২০১৭ সালে দু’বারের নির্বাচনে সব সমীকরণকেই ধুলোয় মিশিয়ে মনিরুল হক সাক্কু ব্যক্তিগত ‘ইমেজ’র জাদুবলে উতরে গেছেন। কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, ওয়ার্ডগুলোতে মেয়রপ্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা এখনো তুলনামূলক কম। কুমিল্লার প্রাণকেন্দ্র আদালতের মোড়ে কথা হয় চায়ের দোকানি মো. ফয়েজের সঙ্গে। সাত বছরের বেশি সময় ধরে এই এলাকায় চা বিক্রি করা ফয়েজ বলেন, কুমিল্লার নির্বাচন পরিস্থিতি গতবারের তুলনায় এবার ভিন্ন। সাক্কু বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন, এটা গতবার নির্বাচনের আগেই বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু এবার সাক্কু নাকি তানিম— কে পাস করবেন বলা মুশকিল। দুজনের মধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।
সাক্কুর জনপ্রিয়তার কারণ
তিনি বলেন, সাক্কু সাধারণ মানুষের কাছে এখনো জনপ্রিয়। তার ইমেজ খুব ভালো। গতবার সাক্কু নিজ দলের বিদ্রোহীকেসহ মোকাবেলা করে মাত্র ৩৪৩ ভোট কম পেয়ে পরাজয় হয়েছিলেন। তখন নিজ দলের অপর প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সারও ৩০ হাজার ভোট পেয়েছিল। নিজাম উদ্দিন কায়সার না থাকলে ওই ৩০ হাজার ভোটের বেশিরভাগ ভোটই সাক্কুর পক্ষে যেতো। তখন আওয়ামী লীগের সবাই সদ্য প্রয়াত মেয়র রিফাতের পক্ষে ছিল এবং সে সময় আওয়ামীলীগের কোন বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেননা তাই আওয়ামীলীগ টেনেটুনে কম ভোটে জয় পেয়েছিল। এবার স্থানীয় আওয়ামীলীগের প্রার্থী সদরের এমপি হাজী আকম বাহারের মেয়ে ডা. তাহসীন বাহার সূচনা নিজ দলের বেশ পরিচিত মুখ আরেক তুখোর ছাত্র নেতার সঙ্গেও তার মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তাছাড়া কিন্তু আফজাল খান পরিবারের সঙ্গে এবার তার বিরোধ আরো প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। যে যাই বলুক কুমিল্লার নির্বাচনে আফজাল খান পরিবার একটা বড় ফ্যাক্ট।
সাক্কুর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা
২০১২ সালে সিটি করপোরেশনে প্রথম মেয়র হয়েছিলেন সাক্কু। সেবার নির্দলীয় ভোটে দলীয় নেতাদের সমর্থনপুষ্টআফজাল খানকে বিপুল ভোটে হারান তিনি। পরের বার ২০১৭ সালেও বিপুল ভোট বেশি পেয়ে টানা দ্বিতীয় বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হন সাক্কু। তৃতীয় বারে ৩৪৩ ভোটে হেরে যেয়ে এবার চতুর্থ বারের মতো মেয়র হওয়ার লক্ষ্যে ভোটের মাঠে নেমেছেন তিনি। মহাণগর আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা নূর উর রহমান মাহমুদ তানিম বলেন, আওয়ামী লীগ অনেক বড় একটি দল। এখানে সবার স্থান আছে। জনপ্রিয় মানুষের স্থান আছে, তেমনি বিতর্কিত মানুষেরও স্থান আছে। সব দলের মধ্যেই সবাই থাকে। আওয়ামী লীগ একটি বিশাল জনসমুদ্র, এখানে যে টিকে থাকার সে টিকবে, যে চলে যাওয়ার সে চলে যাবে। তিনি আরো বলেন, আমরা যখন জাগবো অন্যরা তখন ঘুমাবে। আমাদের রক্ত মুক্তিযোদ্ধার রক্ত। বঙ্গবন্ধু আমাদের শেষ ঠিকানা। আমি কারও সামনে মাথা নত করি না। আমি নিজেই ঝড়, এই ঝড় কারও সামনে মাথা নোয়ায় না
সাক্কুর রাজনৈতিক দর্শন
সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু বলেন, আমি সাক্কু আঙ্গুলের ফাঁক দিয়া কুমিল্লায় জন্ম হইছি না। আমরাও এই কুমিল্লায় ক্ষমতা কি জিনিস দেখছি। আমার ভাই এই সিটে ৫বার এমপি ছিলেন, তিনবার মন্ত্রী ছিলেন। আমার বাবা এমএলএ ছিলেন। ক্ষমতা তিনি (বাহার) আমার চেয়ে বেশি দেখেন নাই।




