ব্যাংকখাতে লুটের ইতিহাস
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংকখাতে সীমাহীন লুটপাট হয়েছে। লুটপাটের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে এ খাত। এসবের অন্যতম সহযোগী ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া গভর্নর এবং ডেপুটি গভর্নররা। তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপে বহু শিল্পগ্রুপ দেশ থেকে ঋণের নামে বিদেশে টাকা পাচার করেছে।
রিজার্ভ এবং গভর্নর নিয়োগে বিতর্ক
এ ছাড়া এ সময়ে ঘটেছে দেশের ইতিহাসে ন্যক্কারজনক রিজার্ভ লুটের ঘটনা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আওয়ামী লীগ আমলের এসব গভর্নর এবং ডেপুটি গভর্নর তালিকা চেয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছে। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে তালিকা পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও তদন্তের জন্য মাঠে নেমেছে। ফলে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এসব কর্মকর্তা ফেঁসে যাচ্ছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগ সূত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
২০০৯ সাল থেকে গত বছরের ৯ আগস্ট পর্যন্ত গত সাড়ে ১৫ বছরে তিনজন গভর্নর এবং ১৩ জন ডেপুটি গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বহাল আছেন ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার ও হাবিবুর রহমান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আন্দোলনের মুখে তিন ডেপুটি গভর্নর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
আওয়ামী লীগ আমলে দায়িত্ব পালন করা তিনজন গভর্নর হলেন— ড. আতিউর রহমান, ফজলে কবির ও আব্দুর রউফ তালুকদার।
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতা নেওয়ার দিন গভর্নর ছিলেন বর্তমান অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। ২০০৯ সালের ১ মে গভর্নর পদে নিয়োগ পান আতিউর রহমান। তার মেয়াদে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ছিল দুর্বলতা। এ সুযোগে সোনালী ব্যাংকে হলমার্ক ও বেসিক ব্যাংকে জালিয়াতির ঘটনা ঘটে।
আবার তার সময়েই ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর বেসরকারি উন্নয়ন বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ঋণ পুনর্গঠন সুবিধা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তার সময় সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি। রিজার্ভ চুরির ধামাচাপা দেওয়ার ‘মাস্টারমাইন্ড’ছিলেন আতিউর। ঘটনার পরই তিনি পদত্যাগ করেন। হাসিনার পতনের পর তিনি দেশ থেকে পালিয়ে যান। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় তার পাসপোর্ট ব্লক করেছে সরকার।
২০১৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ চুরির পর আতিউর পদত্যাগ করলে ওই বছরের ২০ মার্চ সাবেক অর্থ সচিব ফজলে কবির গভর্নর পদে নিয়োগ পান। তার মাধ্যমেই ২০১৭ সালের শুরুতে ইসলামী ব্যাংক ও পরে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক দখল করে এস আলম গ্রুপ। গভীর রাতে ও বাসায় বসে এই দখল অনুমোদন দেন ফজলে কবির। এরপর এসব ব্যাংকে লুটপাট শুরু হলে তিনি তদারকি কমিয়ে দেন।
এ ছাড়া ঋণ নীতিমালায় ছাড় দিয়ে খেলাপি ঋণ গোপন করা ও সুদের হার ৯ শতাংশে আটকে রাখা এবং নামমাত্র টাকা দিয়ে খেলাপি থেকে মুক্ত থাকার পদ্ধতি চালু হয় তার আমলে। ফজলে কবির দেশেই রয়েছেন, তবে হাসিনার পতনের পর তাকে জনসম্মুখে দেখা যায়নি।
২০২২ সালের জুলাইয়ে আরেক সাবেক অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার গভর্নর পদে দায়িত্ব নেন। তার আমলেও আগের মতো বেনামে ঋণ ও জালিয়াতি করে ঋণ বিতরণের ধারা অব্যাহত থাকে। তিনি অনিয়ম বন্ধে উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হন। পরে অনিয়মে যুক্ত ব্যবসায়ীদের সহযোগী হয়ে পড়েন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তিনি এসেই ঋণখেলাপিদের বড় ছাড় দিয়ে নতুন এক নীতিমালা জারি করেন। আবার তার সময়েই এস আলমের ব্যাংকগুলোকে টাকা ছাপিয়ে দেওয়া হয়। এসব টাকাও ঋণের নামে তুলে নেয় এস আলম গ্রুপ। ৫ আগস্টের পর আত্মগোপনে চলে যান আব্দুর রউফ। তিনি দেশে নাকি বিদেশ আছেন, তার কোনো খবর মেলেনি। ব্যাংকখাত থেকে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করার সুযোগ করে দেন তিনি।
এ ছাড়া গত সাড়ে ১৫ বছরে ১৩ জন ডেপুটি গভর্নর দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা হলেন— আবুল কাসেম, আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান, সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরী (এসকে সুর), নাজনীন সুলতানা, এসএম মনিরুজ্জামান, আহমেদ জামাল, কাজী ছাইদুর রহমান, একেএম সাজেদুর রহমান, মাসুদ বিশ্বাস, আবু ফরাহ মোহাম্মদ নাছের, নুরুন নাহার, মোহাম্মদ খুরশীদ আলম ও হাবিবুর রহমান।
এদের মধ্যে এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বহাল আছেন নুরুন নাহার ও হাবিবুর রহমান। নুরুন নাহার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সুপারিশে নিয়োগ পান।
এদের মধ্যে সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী ও বিএফআইইউ সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাস বর্তমানে দুদকের মামলায় জেলহাজতে আছেন। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া সাবেক ডিজি এসএম মনিরুজ্জামান ব্যাংকগুলোর পরিদর্শন বন্ধ করে দেন। বিএফআইইউয়ের সাবেক হেড রাজী হাসানের সময়ে অর্থপাচার হলেও প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা নেননি।
অভিযোগ রয়েছে, ডলার বাজারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন কাজী ছাইদুর রহমান এবং ঋণ নীতিমালা শিথিলের মাধ্যমে পুরো ব্যাংকখাতকে বিপর্যস্ত করে ফেলেন আবু ফরাহ মোহাম্মদ নাছের।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে সাবেক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তাদের বিষয় তদন্তকাজ শুরু করেছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, সরকার একটি নির্দেশনা দিয়েছিল। আমরা সে অনুযায়ী একটি তালিকা প্রস্তুত করেছি। ওই তালিকাটি ইতোমধ্যে সরকারকে পাঠানো হয়েছে।




